BZS ছেড়েছি ২০১০ সালে। ২০০৩ সালে যখন অনেক স্বপ্ন আর সাধ(যদিও সেগুলি যতটা না সেই ছোট্টটি আমার ছিল তার থেকে আমার আশেপাশের মানুষগুলির বেশী ছিল!) নিয়ে BZS এর আঙিনায় পা রাখি তখন আমি নিতান্তই বাচ্চা ছিলাম, সাইজে তো এতটুকুন লিট্টি ছিলাম আর মনে তো বরাবরই শিশু ছিলাম, এখনও হয়তো আছি।

তাও অল্প কদিনেই এই স্বপ্নগুলো অনেকটাই ফিকে হয়ে যায়। যখন দেখতাম সহপাঠীরা সব আগে থেকেই পারে। আর আমি শুধু চেয়ে চেয়ে দর্শকের ভূমিকায় থাকি। তাও ২০০৪ সালে ঠিকই তিন থেকে চার ক্লাসে উঠে যাই। এরপর অনেকগুলো বছর এই ক্যাম্পাসে কাটালেও সেই স্বপ্নগুলোকে কখনোই আর সেভাবে খুঁজে পাইনি, হয়তো খুঁজে দেখিওনি।

যারা খুঁজে দিবেন সেই শ্রদ্ধেয় শিক্ষকেরা তখন যে প্রাইভেট পড়ানোতেই অনেক বেশী ব্যস্ত! যখন বুঝতে পারি প্রাইভেটই পড়তে হবে ততোদিনে দেড়টি বছর নাই! কোচিং, স্কুল দৌড় শুরু হয়ে গেল। ছোট চাকুরে বাবার খরচ বাড়ানোয় লাভের অংকও সেই ছোট্টটি আমাকেই মেলাতে হবে!

ক্লাসে নাকি ‘প্লেস’ পেতে হবে, যদিও আমি কখনো দাঁড়িয়ে ক্লাস করিনি, কাউকে করতেও দেখিনি; তাও কিভাবে আমার ‘প্লেস’ নেই ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। তাও যখন ‘প্লেস’ পাবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েও ধরা দিল না, তখন দেখি ড্রয়িং এ আমি খুবি কাঁচা। মোটেও ‘মার্ক’ পাইনি ওতে। ড্রয়িং এর জন্যও নাকি একজন বিশেষজ্ঞ শিক্ষক আছেন, এবং তিনি প্রাইভেটও নাকি পড়ান।

অতএব তাও শুরু হল! পরের ‘টার্ম’ পরীক্ষাতেই পুরো বাজিমাত, ড্রয়িং এ টপ! কিন্তু এবারও ‘প্লেস’ পাওয়া হল না। এবার ধর্মে ঢাপুস। হুজুর নাকি সবে প্রাইভেট পড়ানো শুরু করেছেন! বাসার পাশে হওয়ার পরেও হুজুরের বাসার থেকে মাঠে যাওয়াই বেশী ভাল লাগল আমার। হয়তো গরীব বাবাটির ‘মাসকাবারি’ হিসাবে আরেকটু ‘ক্রেডিট’ বাড়াতে চাইনি। ছাত্রমুখে কথিত আছে তৎকালীন টপার নাকি সব বিষয়ে প্রাইভেট পড়ত।

এক এক করে অনেকগুলো বছর পেড়িয়ে SSC পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলাম। বেশ ভালোভাবেই পিচ্চি ছেলেটা SSC তে সব বিষয়ে A+ পেয়েছে, সাথে আবার বোর্ড থেকে মেধাবৃত্তি! কম কিসে? অবশ্য এর আগে 5 এবং 8 এও বৃত্তি পাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।

কিন্তু কিসে কী? যখন কলেজে ভর্তি হতে গেলাম তখন ঠাই হল আমাদেরই SHACB তে, যাকে কলেজের থেকে ‘চিড়িয়াখানা’ নামেই বেশী মানায়! যদি ‘চিড়িয়াখানা’ কর্তৃপক্ষ বাধ না সাধে আরকি! স্কুলে দেখা যেত ক্লাসগুলো না হলেও পরীক্ষাগুলো ঠিকই হত এবং তা দেয়াও বাধ্যতামূলক ছিল, ফলে একটা পরিবেশ ছিল শেখার কিছু জানার। কিন্তু SHACB তে পরীক্ষাগুলোই সিরাম হত! ১০০ মার্কসের পরীক্ষা তারা ২৫ এই সেরে নিত। অতো সময় কই যে ১০০ মার্ক এর পরীক্ষা নিবে? তাদের ‘ব্যাচ’ এ পড়াতে হবেনা বুঝি?!

আর শেখার পরিবেশ? পরীক্ষার এক সপ্তাহ আগেও স্যাররাই জানতেন না কখন কোথায়, কিংবা আদৌ পরীক্ষা হবে কিনা! গেলাম স্যারদের ‘প্রাইভেট ব্যাচ’ এ। সেখানকার অবস্থা পুরো ‘অসাম’(awesome)। কে আসছে আর কে যাচ্ছে কোনো কেয়ার নেই। স্যারদের মধ্যে প্রতিযোগিতা কে আগে এই ‘ছোট খোকা’ গুলোকে আগে ‘বড়’ করতে পারেন!

তবুও লড়েছি, একদম ছেড়ে দেইনি। স্কুলের তুলনায় সিলেবাস ভিন্ন বলে ঠিক ওভাবে খাপ খাইয়ে উঠতে পারিনি। তা নিয়ে কারো সাথে কথা বলতে গেলে মিলত কিছু ঝাড়ি, কিছু আশা, কিছু প্রত্যাশা, আর সবশেষে “First year damn care” টাইপের মহামূল্যবান উক্তি। কোনোমতে first year পেড়োলেও ‘শেখা’ হয়নি তেমন কিছুই।

একরকম বলতে গেলে এত্তোগুলো শিক্ষক কি ঘরে কি বাইরে (এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে একসময় আটটা প্রাইভেটও পড়েছি আমি যেখানে সাবজেক্টই ছয়টা!) কিছুই দিতে পারেনি, হয়তো আমিই নিতে পারিনি। পাঠ্য বইয়ের হুবহু বলে গেছেন তারা, Extra কোনো Trick কিংবা তার কোনো Quote কিছুই জোটেনি আমাদের। ফলে একগাদা জানার থেকে একটু শেখার যে তীব্র ইচ্ছা তা দমিয়ে রাখতে হল।

অবশ্য এতে একটা কাজের কাজ হয়েছে বটে, আমার সব কথারা, ইচ্ছেরা, আর স্বপ্নেরা বাস্তবে ডানা ঝাপটাতে না পারায় মনের আঙিনাতেই ডানা মেলে দিয়েছে; আমি খুঁজে পেয়েছি আমাকে। কিন্তু আমার Career নিয়ে এতো সচেতনতা, এতো ইচ্ছা, আগ্রহ সব জলে ফেলে দিয়ে গেছে। ছোটবেলার সেই জানার আগ্রহটা, শেখার ইচ্ছেটা ঠিক ওভাবে হারিয়ে যায়নি বলেই হয়তো আমার কোনো স্যারের কাছেই বেশীদিন টিকতে পারিনি, তাদের ঝোলা যে অল্পতেই খালি হয়ে যায়!

সুকুমার থেকে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কিংবা হালের হুমায়ূন, অথবা সুনীল; অনেক পড়তাম আমি। তবে জোর করে ‘গেলানো’ হয় বলেই হয়তো পাঠ্য বইয়ের প্রতি একটু অ্যালার্জি ছিল। মা-বাবা অনেক বকলেও কখনো আমার বই টই ধরেও দেখেনি। ভাগ্যিস ধরেনি, নইলে এতো বই কি কিনতে পারতাম! অনেক অনেক বই কেনার বাতিক আছে আমার। কিন্তু সেই System আমায় ২ বছর কিংবা ২৪ মাস অথবা ৭৩০ দিনের কথা বলে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি করালেও ১৬/১৭ মাসেই খেল খতম করে দিল!

আর ওদিকে শিক্ষামন্ত্রী তার সূর্যসন্তানদের ‘মেডেল’ দিতে দিতে জোর গলায় বলেন, “তোমাদের মানুষ হতে হবে। শুধু শিক্ষিত হলেই হবে না, নিষ্ঠাবানও হতে হবে।” আর এতো রীতিমত প্রতারণা।

হ্যাঁ, HSC উতরে গেছি আমি, আবারো বেশ ভালোভাবেই গেছি। গোল্ডেনও পেয়েছি। তো কি হয়েছে? আমার শেখা তো কিছুই হলনা। আমি, আমরা তো এখনো কিছু শেখার আশায় ছুটছি কিন্তু যারা এই System এর বলি হয়ে জীবিত লাশ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর সমাজের সেরা ছেলেটি কিংবা মেয়েটি হয়ে উঠছে সেই System এরি কল্যাণে তাদের এই মৃত্যুর জন্য কে দায়ী? এ দায় কার? অনেক দায় আছে, কেউ কি নিবে একটু? জানি নেবে না। আমরা মানুষেরা কারো দায় কেউ নেই না, পারলে নিজেরটাও অন্য কাউকে বিভিন্ন উপলক্ষে উপহার দিয়ে বেড়াই! তবুও আমরাই নিজেদের অনেক ‘দায়িত্ববান’ বলে প্রচার করে বেড়াই, নামের সাথে ডিগ্রীর বিলবোর্ড লাগিয়ে ঘুরে বেড়াই!

এখন নাকি আবার ভর্তি পরীক্ষা দিতে হবে!‘মহা’ থেকে আরেকটু বড় ‘বিশ্ব’বিদ্যালয়ে যেতে হবে যে। তার জন্য অনেক শেখার দরকার নেই, কোচিং করার টাকা থাকলেই হবে! আবার শুরু সেই দৌড়। এতো পড়ে কি হবে যদি কিছু নাই শিখলাম?!

আমি কখনো ক্লাসে টপার হতে পারিনি, একদম সত্যি বলতে কখনো যে হতে ইচ্ছে করেছে তাও না। কেন করেনি তা আমার কাছেই এক বিস্ময়! যেমনটা এখন ‘বড়’ কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার লোভে পড়ছি না। হয়তো এতদিনেও করায়ত্তে আনতে না পেরে System’এর কোনও চাল!

একগাদা গিলে এই পরীক্ষা সেই পরীক্ষায় উগরে দিতে দিতে আমাদের পেটে এখন আর কোনোকিছুই সয়না। পেটের ব্যথায় ঠিকমতো দাঁড়াতে পর্যন্ত পারছি না আমরা। সম্ভাবনাগুলো শুরুর আগেই দুর্ভাবনায় রূপ নেয়। ফুলগুলো ফোটার আগেই ফোটানো হচ্ছে, সৌরভ ছড়ানোর আগেই ‘পারফিউম’ ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে! এতো কৃত্রিমতায় টিকতে না পেরে সময়ের আগেই ঝড়ে যাচ্ছে। যারা টিকছে তারা নেহায়েত বাবার টাকায় কেনা ‘ডীপ ফ্রিজে’ সংরক্ষিত বলে! শুধু টিকেই আছে কিন্তু নির্বাক, নিস্তরঙ্গ; জীবনের লেশমাত্রও সেখানে কল্পনাতীত। যাই দেখুক, যাই শুনুক তারা শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়েই থাকে। নড়বে কি করে? কবেই ভিতরটা জমাট বেঁধে গেছে তা হয়তো নিজেও জানতে পারেনি!

আর দেশ? দেশের চুড়োতে যারা ওঠে সেই চাঁদ-সুরুজেরা প্রত্যহ সকাল বিকেল নিয়ম করে ইথিওপিয়ার রাজধানী অমুক তো কম্বোডিয়ার মুদ্রা তমুক নামক বড়ি খেয়ে BCS নামক মহা উৎসবে হিরোর পাটে অভিনয় করে একেকজন দেশকর্তা বনে যান।

আর এই কাজ সেই কাজ করে করে ইথিওপিয়ার রাজধানী রেখে, পরিবার নিয়ে অ্যামেরিকাই ঘুরে আসেন আর কম্বোডিয়ার মুদ্রার বদল্‌ ঠিক ডলারই জমে সুইস ব্যাংকে। কিন্তু যখন দেশের প্রয়োজনে অসৎ রাজনীতিবিদদের থেকে দেশকে বাঁচাতে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হয় তখন সচকিত হয়ে দেখেন তাদের পিঠের মাঝখানটা স্রেফ ফাঁকা, কখনো কিছু ছিল কিনা তা মনে করতেও কষ্ট হয়! শেষ কবে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন কিংবা আদৌ দাঁড়িয়েছিলেন কিনা, ঠিক মনে পড়ে না।

রোদে পোড়া বাদামী চামড়ার বদলে তাদের গায়ে সাহেবি কোট আর বাহারি টাই ঝুলতে দেখা যায় প্রায়শই। তাদের গায়ের চামড়াটি খুলে Air Conditioned কামরায় বসিয়ে দেয়া হয়। তারা সকাল বিকাল Air Conditioned গাড়িতে করে Air Conditioned অফিসে যান আবার বাসায় ফিরে Air Conditioned রুমে বসেই, স্ত্রীর সাথে চায়ে চুমুক দেন আর দেশের অবস্থা নিয়ে গভীর আলোচনা করেন, শেষ অবধি সমাধানে আসেন এই বলে যে, হ্যা শিক্ষা, শিক্ষাই পারে দেশকে বদলে দিতে।

তাই প্রতি বছর নতুন নতুন পদ্ধতি প্রবর্তিত হয়, নতুন নতুন বই আসে, এমনকি ইদানীং নাকি নতুন নতুন বানানও আসছে! ফিবছর বাজেট বাড়ে শিক্ষাখাতের। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষকদের সামান্য কটা টাকায় সংসার চলে না বলে চক্ষুলজ্জা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে যখন বেতন বাড়াতে বলেন তখন তারা Spicy Red Chili Soup আর o-Chlorobenzylidene Malononitrile এর সাথে আপ্যায়িত হন! এতো গেল জলখাবার; কেউ কেউ আবার ঢাকা মেডিকেল কিংবা অন্যান্য মেডিকেলে সুন্দরী ইন্টার্ন নার্সদের সেবা পান একদম মুফতে! তারপরেও তারা নির্বাচনের আগে চেঁচিয়ে বেড়ান হ্যান করেঙ্গা, ত্যান করেঙ্গা, তোদের গিনিপিগ বানিয়ে ছাড়ুঙ্গা ইনশাল্লাহ!

চারপাশে তাকালে শুধু লাশই দেখা যায়। এরা হাঁটছে, ঘুরছে, ঘুমাচ্ছে ঠিকই কিন্তু অনেক আগেই জীবন তাদের ছেড়ে পালিয়েছে! এতোকিছুর পরেও নিজেকেই হারিয়ে খুঁজছি, পাবো কিনা জানি না তবুও খুঁজছি তো। অদৃশ্য হলেও অস্তিত্বটুকু হারিয়ে ফেলিনি, তাই বা কম কীসে?

১৩১১১৭

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *